নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে রাজপথের বিএনপি

নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে রাজপথের বিএনপি

  ২৪ সেপ্টে ২০২২

নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবিতে অনড় রাজপথের প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে সম্পন্ন করার দাবি আদায়ে রাজপথকেই বেছে নিয়েছে বিএনপি। দলটি বলছে, এই দাবি পূরণ না হলে তারা আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেবে না। দেশে নির্বাচন করতেও দেবে না। এ দাবিকে কেন্দ্র করে বিএনপি এখন নানাভাবে নিজেদের ভিত শক্ত করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি সরকারবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে আগামী মাসেই যুগপৎ আন্দোলনে যাচ্ছে।

২০০৬ সালের পর থেকে বিএনপি চেষ্টা করেও ঘুরে দাঁড়াতে হিমশিম খাচ্ছে দলটি। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া রাজনীতে সক্রিয় হতে পারছে না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দণ্ড মাথায় নিয়ে লন্ডনে। এই পরিস্থিতিতে ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে আলাপ-আলোচনায় সংকট সমাধানের কোনো পথ দেখছেন না বিএনপি নেতারা। নেতারা বলছেন, আন্দোলনের আর কোনো বিকল্প নেই। রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমেই সমস্যার সমাধান করতে হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে সোচ্চার হলেও সরকারের বিরুদ্ধে মাঠের আন্দোলনে অনেকাংশে সতর্ক বিএনপি। এবার কিছুটা ভিন্ন পদ্ধতিতে লক্ষ্যে পৌঁছাতে পরিকল্পনার ছক করা হচ্ছে। বিএনপির চলমান আন্দোলন কর্মসূচি দমনে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে আওয়ামী লীগ আগেভাগেই হামলা ও মামলার পথে হাঁটছে, তাতে মাঠপর্যায়ে শক্ত অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রকার ছাড় দেওয়া হবে না। বিএনপি হাইকমান্ডও এটাও মনে করছে, রাজপথের আন্দোলনের মধ্য দিয়েই সব সমস্যার সমাধান হবে। সেটা মাথায় রেখেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন দলের নেতা-কর্মীরা।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি না মানলে রাজপথেই সরকার পরিবর্তন করা হবে। তিনি বলেন, এখন রাজপথই একমাত্র সমাধান। সরকার যদি নিজেরা উদ্যোগ না নেয়, এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে আমরা যে দাবিগুলো করেছি তা না মানলে- রাজপথেই একমাত্র সমাধান। নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিএনপিকে কোণঠাসা করে রাখার নানা কৌশল নিয়ে এগোচ্ছে। বিশেষ করে নির্বাচন কেন্দ্রিক বিকল্প জোট দাঁড় করানো, বিএনপির মধ্যে ভাঙন ধরানো, দলটির মিত্রদের কাছে টানার কৌশল নিয়েছে। এ ছাড়া, সরকার ও সরকারি দল বিরোধী নেতা-কর্মীদের ভয় দেখাতে হামলা-মামলার পথে হাঁটা, বিএনপিকে আর্থিকভাবে সহায়তা করে এমন নেতাদের নানাভাবে হয়রানি করা, প্রয়োজনে শারীরিকভাবে আঘাত করতেও পিছপা হবে না। মূলত কর্মসূচিতে এই মুহূর্তে বাধা তৈরি করার মধ্য দিয়ে বিএনপিকে দুর্বল অবস্থায় রাখতে চায় ক্ষমতাসীনরা। এসব কারণে মাঠের আন্দোলনে যেমন সতর্ক বিএনপি, তেমনি ঐক্যবদ্ধতা অটুট রেখে যুগপৎ আন্দোলনে যেতে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে পাশে রাখতে চেষ্টা অব্যাহত আছে।

বিএনপি সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন, রাজনীতিতে সমঝোতার লক্ষণ দেখছে না বিএনপি। তাই দাবি আদায়ে আন্দোলনের পথেই হাঁটার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। রাজপথ আন্দোলনেই দাবি আদায় করা হবে। নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠা করা হবে। আন্দোলন সফল করতে যে কোনো ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুতি নিচ্ছে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মীরা। আন্দোলন করতে ছাড় দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায়ে যুগপৎ আন্দোলন ও নির্বাচনোত্তর জবাবদিহি রাষ্ট্র-রূপান্তরমূলক কর্মসূচির রূপরেখা চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপের পরিপ্রেক্ষিতে এ রূপরেখা প্রণয়ন করেছে। দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদনের পর আগামী মাসের মাঝামাঝি দেশবাসীর সামনে এ রূপরেখা উপস্থাপন করবে বিএনপি। যুগপৎ আন্দোলনের লক্ষ্যে এরই মধ্যে ডান-বাম-ইসলামী ২২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংলাপ করেছে বিএনপি।

সূত্র জানায়, প্রথম পর্বে সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে শর্তের ভিত্তিতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটিয়ে নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে যুগপৎ আন্দোলন গড়ে তোলা হবে। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তীকালীন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন গুরুত্বের সঙ্গে থাকছে। আন্দোলনের গতি-প্রকৃতির নিরিখে যুগপৎ, নাকি স্ব-স্ব মঞ্চ থেকে চলবে। সূত্র জানায়, বিএনপির সঙ্গে সংলাপে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের যেসব প্রস্তাব দিয়েছে, তার অধিকাংশই বিএনপির রূপরেখায় স্থান পেয়েছে। বিএনপির চিন্তার সঙ্গে সমমনা ওই সব দলের পরিকল্পনাও প্রায় একই হওয়ায় রূপরেখা নিয়ে মতপার্থক্য হবে না। রূপরেখায় রাষ্ট্রকাঠামো সংস্কারের লক্ষ্যে অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে জয়লাভের পর সংবিধানের সামগ্রিক পর্যালোচনায় সাংবিধানিক সংস্কার কমিশন গঠন, প্রশাসনিক সংস্কারের লক্ষ্যে প্রশাসনিক সংস্কার কমিশন, গণমানুষের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে জুডিশিয়াল কমিশন, সৎ সাংবাদিকতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে মিডিয়া কমিশন, অর্থনৈতিক ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশনের প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করা হবে।

গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে স্থায়ী সাংবিধানিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে নির্বাচনকালীন দলনিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন, প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রপতি ও সরকারের প্রধানমন্ত্রীর নির্বাহী ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় আনয়ন, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠায় রাষ্ট্রের তিনটি বিভাগের মধ্যে ক্ষমতা এবং দায়িত্ব ও কর্তব্যের সমন্বয়, স্বাধীন ও শক্তিশালী নির্বাচন কমিশন গঠনের উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন সংশোধন, কিছু স্পর্শকাতর ক্ষেত্র ছাড়া অন্য সব বিষয়ে সংসদ সদস্যদের মতামত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে ৭০ অনুচ্ছেদের সংশোধন, শুনানির মাধ্যমে সংসদীয় কমিটির ভেটিং সাপেক্ষে রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় নিয়োগ, বিচার বিভাগের জন্য সুপ্রিম কোর্টের নিয়ন্ত্রণে একটি পৃথক সচিবালয় প্রতিষ্ঠা ও যোগ্যদের বিচারপতি নিয়োগের লক্ষ্যে ৯৫(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রবর্তন করা হবে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে স্থায়ী কমিটি। অতি দ্রুত আন্দোলনের রূপরেখা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *